Home বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়: ট্রাস্টিরা এক বছরে শুধু ভাতাই নিয়েছেন ৪ কোটি টাকা

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়: ট্রাস্টিরা এক বছরে শুধু ভাতাই নিয়েছেন ৪ কোটি টাকা

196
0
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) প্রতিটি সভায় সিটিং অ্যালাউন্স বাবদ একেকজন সদস্য নিয়েছেন ১ লাখ টাকা করে। অন্য সব কমিটির সভায় নিয়েছেন ৫০ হাজার টাকার ভাতা। গাড়িচালক ও জ্বালানি বাবদ প্রত্যেক মাসে ভাতা নেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে। অলাভজনক হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে ভাতার নামে এমন নানা আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (এনএসইউ) বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যরা। শুধু ২০১৯-২০ অর্থবছরেই শিক্ষার্থীদের দেয়া টিউশন ফির অর্থ থেকে ভাতা বাবদ ৪ কোটি টাকা নিয়েছেন তারা।

নর্থ সাউথ নিয়ে এমনই একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বণিক বার্তায় । প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সাইফ সুজন।

উপাচার্যসহ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ট্রাস্টি সদস্য রয়েছেন ১৬ জন। এর মধ্যে ছয়-সাতজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নেন। এর বাইরে কয়েকজন সদস্য মাঝেমধ্যে বিভিন্ন সভা ও অনুষ্ঠানে অংশ নিলেও বাকিরা একেবারেই অনুপস্থিত থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১ জন বিওটি সদস্য শুধু সিটিং অ্যালাউন্স বাবদই নিয়েছেন ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা। যদিও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি সদস্যদের প্রায় সবাই দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

নর্থ  সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের তালিকা দেখতে এখানে ক্লিক করুন

বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে ট্রাস্টিদের এ ধরনের আর্থিক সুবিধা নেয়াকে অনৈতিক ও অবৈধ বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ। তিনি বলেন, ট্রাস্টিরা হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের জোগানদাতা। তারা যদি কোনো আর্থিক সুবিধা নেন সেটি অনৈতিক ও অবৈধ। আর্থিক সুবিধা নিলে তো ট্রাস্টের ডিড ভঙ্গ হয়ে যায়। শুধু সিটিং অ্যালাউন্স নয়, কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাকালীন ও আজীবন সদস্য হিসেবে রয়েছেন রেমন্ড গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি বেনজীর আহমেদ। তিনি এনএসইউ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সিটিং অ্যালাউন্স নেয়ার ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে রয়েছেন বেনজীর আহমেদ। এই ট্রাস্টি ওই অর্থবছরে শুধু সিটিং অ্যালাউন্স বাবদই ৫০ লাখ টাকার বেশি আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

এনএসইউ ট্রাস্টের আরেকজন প্রতিষ্ঠাকালীন ও আজীবন সদস্য বেঙ্গল ট্রেডওয়েজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেহানা রহমান। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সিটিং অ্যালাউন্স নেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন তিনি। এই ট্রাস্টি ওই অর্থবছরে শুধু সিটিং অ্যালাউন্স বাবদই ৪৩ লাখ টাকার বেশি গ্রহণ করেছেন।

এনএসইউ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাকালীন আজীবন সদস্যদের মধ্যে অন্যতম পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ হাসেম। গত অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিটিং অ্যালাউন্স নেয়ার ক্ষেত্রে তার অবস্থান তৃতীয়। ওই অর্থবছরে শুধু সিটিং অ্যালাউন্স বাবদই ৪০ লাখ টাকা নিয়েছেন দেশের প্রতিষ্ঠিত এ ব্যবসায়ী।

সিটিং অ্যালাউন্স নেয়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছেন প্রতিষ্ঠাকালীন আরেক আজীবন সদস্য ও মিউচুয়াল গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমেদ। এ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীও ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকার সিটিং অ্যালাউন্স নিয়েছেন।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও আজীবন সদস্য হিসেবে রয়েছেন শাহ ফতেহউল্লাহ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও জালাল আহমেদ স্পিনিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ ট্রাস্টি সিটিং অ্যালাউন্স বাবদ নিয়েছেন ৩৫ লাখ টাকার বেশি। এছাড়া ভ্রমণ ভাতাসহ নামে-বেনামে আর্থিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে এ সদস্যের বিরুদ্ধে। এমনকি বিদেশে অবস্থানরত তার স্ত্রীও বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন উপদেষ্টা হিসেবে প্রতি মাসে সম্মানী বাবদ ১ লাখ টাকা করে পেতেন। যদিও বিদেশে অবস্থান ও বার কাউন্সিলের সনদ জমা না দেয়ায় সম্প্রতি তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ট্রাস্টের ডিডে সিটিং অ্যালাউন্স নেয়ার বিধান রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি বলেন, ট্রাস্টের ডিডে সদস্যদের সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। সেই ডিড শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি অনুমোদন দিয়েছে। আর আমরা সব সুবিধাই নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করি। আর আমার স্ত্রীর বার কাউন্সিলের সনদ জমা না দেয়ার জন্য নয়, বরং বিদেশে থাকায় সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নেই।

এনএসইউ ট্রাস্টের বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা আজীবন সদস্য হিসেবে রয়েছেন মিউচুয়াল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এমএ কাসেম। প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য এ ব্যবসায়ীও গত অর্থবছরে ৩০ লাখ টাকার বেশি সিটিং অ্যালাউন্স নিয়েছেন। সদস্যদের মতামতের কারণেই সিটিং অ্যালাউন্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে দাবি এমএ কাসেমের। তিনি বলেন, আমাদের ট্রাস্টি সদস্যদের সবাই যার যার অবস্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত ও খুবই ব্যস্ত। এজন্য তারা অনেকেই সময় দিতে চান না। তাই সিটিং অ্যালাউন্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

অন্য ট্রাস্টি সদস্যদের মধ্যে মাহবুবুর রহমান ২০ লাখ, তানভীর হারুন ১৫ লাখ, ফৌজিয়া নাজ ১০ লাখ ও সৈয়দ আহাদ ৫ লাখ টাকার সিটিং অ্যালাউন্স নিয়েছেন।

সিটিং অ্যালাউন্সের বাইরেও নানা আর্থিক সুবিধা নেন ট্রাস্টি সদস্যরা। এর মধ্যে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন ভাতা হিসেবে প্রতিদিন ৫০০ ডলার করে নেন ট্রাস্টিরা। যদিও এসব ভাতার ভ্যাট ও ট্যাক্সও পরিশোধ করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে।

করোনাকালে ভার্চুয়াল সভায়ও একই হারে সিটিং অ্যালাউন্স: করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে বিওটি ও অন্যান্য কমিটির সভা অনলাইনে পরিচালনা করছেন নর্থ সাউথ ট্রাস্টিরা। ভার্চুয়াল এসব সভায়ও আগের হারেই সিটিং অ্যালাউন্স নিচ্ছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। সিটিং অ্যালাউন্সের বিষয়টিও বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত। এ বিষয়ে আমার মন্তব্য করার সুযোগ নেই।

বিলাসবহুল গাড়ি ও গাড়িচালক এবং জ্বালানি ভাতা: গত বছর ল্যান্ড রোভারের রেঞ্জ রোভার ২০১৯ মডেলের নয়টি বিলাসবহুল গাড়ি কেনে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি সদস্যরা এ গাড়িগুলো ব্যবহার করছেন। গাড়ির রেজিস্ট্রেশনসহ একেকটি গাড়ি কিনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন কোটি টাকা। এমনকি গাড়ির জ্বালানি ও চালকের বেতনের অর্থও পরিশোধ করা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় তহবিল থেকে। জ্বালানি বাবদ প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা নিচ্ছেন ট্রাস্টিরা। আর চালকের বেতনও ২০-২৫ হাজার টাকা।

সিটিং অ্যালাউন্স নিতে অপ্রয়োজনীয় কমিটির সৃষ্টি: সিটিং অ্যালাউন্স নিতে নানা অপ্রয়োজনীয় কমিটি গঠনের অভিযোগও রয়েছে এনএসইউ ট্রাস্টের বিরুদ্ধে। এসব কমিটির মধ্যে রয়েছে প্রোগ্রাম রিভিউ কমিটি, প্রশাসনিক পদোন্নতি কমিটি, শিক্ষক পদোন্নতি কমিটি, লাইব্রেরি কমিটি, শিক্ষক অনুসন্ধান কমিটি, ডিগ্রি পর্যালোচনা কমিটি, ছাত্র ভর্তি কমিটি, নিড অ্যাসেসমেন্ট কমিটি, টেকনিক্যাল কমিটি, ক্রয় কমিটি, শিক্ষক ছুটি কমিটি, একাডেমিক রিভিউ কমিটি, কনফারেন্স ট্রাভেল ও রিসার্চ গ্র্যান্ট কমিটি, আইন ও সাংবিধানিক কমিটি, ছাত্র বৃত্তি কমিটি, ক্যাম্পাস উন্নয়ন কমিটি, অডিট কমিটি, ইন্টারন্যাশনাল প্রমোশন অ্যান্ড অ্যাফিলিয়েশন কমিটি ও অন্যান্য কমিটি। এসব কমিটিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের সভায় যেকোনো ট্রাস্টি অংশ নিতে পারবেন বলে রেজল্যুশন অনুমোদন করেছে এনএসইউ ট্রাস্ট।

এসব কমিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিগ্রি পর্যালোচনা, ছাত্র ভর্তি, লাইব্রেরি ও ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি ছাড়া বাকি ১৫টিই বাতিলের সুপারিশ করেছিল ইউজিসি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অপ্রয়োজনীয় হওয়ায় এগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছিল ইউজিসি। ওই সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর কয়েক বছর পেরোলেও কমিটিগুলো বাতিল করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) একেএম আফতাব হোসেন প্রামাণিক বলেন, শুধু নর্থ সাউথ নয়; বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি সদস্যরাই সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ করেন। যদিও এ ধরনের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ট্রাস্টের দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আমি যতদূর জানি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট বর্ণনা নেই। এ সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।





শিক্ষার নির্ভুল সংবাদ সবার আগে পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ডিজিটাল প্রযু্ক্তির মাধ্যমে।
আমাদের সাথে ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেও যুক্ত থাকতে পারেন।
যে কোন প্রতিবেদন মেইলে পাঠাতে পারেন
educationbd247@gmail.com 

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here