Home চাকরির খবর এসএসসি পাশ যোগ্যতায় স্পিচ থেরাপিস্ট পদ সৃষ্টি!

এসএসসি পাশ যোগ্যতায় স্পিচ থেরাপিস্ট পদ সৃষ্টি!

192
0

মুন্না রায়হান

আইনে স্পিচ থেরাপিস্টের যোগ্যতা বিএসসি ইন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি নির্ধারিত থাকলেও সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে জানানো হয়েছে এসএসসি পাশ হলেই নাকি চলবে! শুধু তাই নয়, আইনে এই পদের জন্য নবম গ্রেডের কথা উল্লেখ থাকলেও দুই ধাপ পিছিয়ে তা ১১তম গ্রেড নির্ধারণ করা হচ্ছে। গত ২৬ অক্টোবরের ঐ আদেশে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন অস্থায়ী রাজস্ব খাতে স্পিচ থেরাপিস্টের যে পদ সৃজনের কথা বলা হয়েছে তাতে এসএসসিসহ এক বছরের প্রশিক্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্পিচ থেরাপিস্টের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি পাশ চাওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর ‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮’ এ স্পিচ থেরাপিস্ট/স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট পদের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে সরকার স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাচেলর ইন সায়েন্স ইন (ফিজিওথেরাপি/অকুপেশনাল থেরাপি/স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপি) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিসহ এক বছরের ইন্টার্নশিপ নির্দিষ্ট করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, একজন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট গবেষণালব্ধ চিকিত্সা পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্ন ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে ব্যক্তি, পরিবার ও গোষ্ঠীকে যোগাযোগ ও খাদ্যগ্রহণ বিষয়ক সমস্যার চিকিত্সাসেবা দেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেরিতে কথা বলা শিশু, অটিজম, সেরিব্রাল পালসি, ড্রাউন সিন্ড্রোম ও বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের মতো জটিল স্নায়ু বিকাশজনিত সমস্যা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, ঠোঁট ও তালু কাটা, কণ্ঠস্বরে বিকৃতি, শিশু ও ব্যক্তির তোতলামো, স্ট্রোক, মটর নিউরন ডিজিজ, পারকিনসন্স ডিজিজ এমনকি বার্ধক্যজনিত কারণে যোগাযোগ সমস্যা ও যে কোনো খাদ্য গলাধঃকরণের সমস্যায় আক্রান্ত শিশু ও ব্যক্তি রয়েছে তাদের স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপি প্রয়োজন। যা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছাড়া চিকিত্সাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের কোনো সরকারি হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজে স্পিচ থেরাপিস্টের কোনো পদ নেই। এ অবস্থায় চলতি বছরের ২৬ অক্টোবর স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন অস্থায়ী রাজস্ব খাতে স্পিচ থেরাপিস্ট পদ সৃষ্টির জন্য এক স্মারক প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, শেরে বাংলা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে স্পিচ থেরাপিস্টের এ পদ সৃজনের কথা বলা হয়েছে।

স্পিস থেরাপিস্ট পদ সৃষ্টির এই আদেশে যোগ্যতা হিসেবে বলা হয়েছে, সরকার কর্তৃক স্বীকৃত বোর্ড হতে এসএসসি পাশসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এক বছরের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন অথবা ডিপ্লোমা/সার্টিফিকেটধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আর গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে ১১তম। অথচ ‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন, ২০১৮’ এ স্পিচ থেরাপিস্ট/স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্ট পদের জন্য ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে সরকারের স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাচেলর ইন সায়েন্স ইন (ফিজিওথেরাপি/অকুপেশনাল থেরাপি/স্পিচ ও ল্যাংগুয়েজ থেরাপি) বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিসহ এক বছরের ইন্টার্নশিপ নির্দিষ্ট করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেরিতে হলেও দেশের মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে স্পিচ থেরাপিস্ট পদ সৃজনে সরকারের এ উদ্যোগ চিকিত্সাসেবার অগ্রগতিতে একটি বড় ব্যাপার; কিন্তু এ পদের জন্য যে যোগ্যতা ও গ্রেডের কথা বলা হয়েছে তা আইন পরিপন্থি ও এই পেশার জন্য অত্যন্ত আপত্তিকর। পেশাজীবী পদ ও গ্রেড কঠোরভাবে নিশ্চিত করা না হলে সাধারণ মানুষ স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি পেশা সম্পর্কে বিভ্রান্ত হবেন এবং রোগীরা অপচিকিত্সার শিকার ও প্রকৃত স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হবেন।

দেশে ২০০৪ সালে প্রথম সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনকেন্দ্র সিআরপির প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন্স ইনস্টিটিউটে (বিএইচপিআই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিত্সা অনুষদের অধীন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপির ওপর এক বছর বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপসহ পাঁচ বছরমেয়াদি স্নাতক প্রোগ্রামটি শুরু হয়। বর্তমানে দেশে ১৫০-এর ওপরে স্নাতক ডিগ্রিধারী স্পিচ থেরাপিস্ট রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশন্স ইনস্টিটিউটের (বিএইচপিআই) স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজের এ স্নাতক কোর্সটিতে ভর্তির জন্য একজন শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিকে বাধ্যতামূলক জীববিজ্ঞানসহ ন্যূনতম জিপিএ-৭.০০ নিয়ে পাশ করতে হয়। শুধু তাই নয়, ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হতে হয়। তিনি বলেন, পাঁচ বছরের কোর্সে চিকিত্সা বিজ্ঞানের অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পাশাপাশি আরো অনেক বিশেষায়িত বিষয়ে পাঠদান করানো হয়। বিএইচপিআইর এই সহকারী অধ্যাপক বলেন, কোর্সের পুরো কারিকুলামটি ৩৮টি মডিউলে বিভক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বাক্, শ্রবণ, ভাষা ও খাবার গলাধঃকরণজনিত সমস্যার প্রকৃতি নির্ণয়, পরিমাণ, নির্ধারণ ও চিকিত্সা পদ্ধতি এবং ব্যবস্থাপনা শেখানো হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্পিচ থেরাপিস্টের মতো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে কীভাবে যোগ্যতা হিসেবে এসএসসি পাশ চাওয়া হচ্ছে তা বুঝতে পারছি না।

বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিলের সদস্য ও সোসাইটি অব স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপিস্টের (এসএসএলটি) সভাপতি ফিদা আল-শামস গতকাল বলেন, স্পিচ থেরাপিস্ট পদের জন্য যে যোগ্যতা ও গ্রেডের কথা বলা হয়েছে তা আইন পরিপন্থি ও এই পেশার জন্য অত্যন্ত আপত্তিকর। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি যেন আইনে যে যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে সে অনুযায়ী স্পিচ থেরাপিস্টের পদ সৃজন করা হয়। তা না হলে রোগীরা অপচিকিত্সার শিকার হবেন।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডাইরেক্টর (এডুকেশন) অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম গতকাল বলেন, স্পিচ থেরাপিস্ট পদ সৃজনের জন্য ১০/১২ বছর আগে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন এই যোগ্যতার কথা বলা হয়েছিল; কিন্তু এরপর আইনে স্পিচ থেরাপিস্টের যোগ্যতা যে স্নাতকসহ এক বছরের ইন্টার্নশিপ করা হয়েছে তা সম্ভবত জানা ছিল না। এটা আসলে ভুল হয়েছে। আইনে স্পিচ থেরাপিস্টের যে যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে এটা খুবই ভালো। কারণ এতে আরো অধিকতর যোগ্য স্পিচ থেরাপিস্ট আসবে। চিকিত্সাসেবা উপকৃত হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা খুব শিগিগরই এ ব্যাপারে অধিদপ্তর থেকে একটা সংশোধনী দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠাব।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here