Home মতামত অবহেলায় প্রাইমারি শিক্ষা; এখনই গুরুত্ব দেয়া জরুরি

অবহেলায় প্রাইমারি শিক্ষা; এখনই গুরুত্ব দেয়া জরুরি

1330
0

ছিদ্দিকুর রহমান

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। প্রাথমিক শিক্ষা হলো সকল শিক্ষার মূল ভিত্তি। শিশুর কোমলমতি কচি মনে জ্ঞান অন্বেষণের প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি করা এবং তাকে উন্নত জীবন দর্শনে উদ্ধুদ্ধ করার মূল ক্ষেত্র হলো প্রাথমিক স্তর। শিশু বেড়ে উঠার পাশাপাশি যাতে করে জ্ঞান সাধনার অনুপ্রেরণা পায়, সেই জন্য দরকার তার ইতিবাচক মনস্তাত্বিক পরিবর্তন। শিশুর উৎসুক ও অনুসন্ধিৎসু মন সৃষ্টির সহায়ক দায়িত্বটি পালন করে থাকেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আধুনিক সভ্যতার অবারিত সুযোগ সুবিধার বদান্যতায় আজকাল অধিকাংশ শিশুর মানসিক বিকাশের কাজটি প্রাথমিক স্তরেই প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। শিক্ষক প্রহার করলে তাঁর বিরূদ্ধে মামলা দায়েরের হুমকি; শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রেম সংক্রান্ত আবেগিক চিরকুট চালাচালি ইত্যাদি ঘটনা প্রমাণ করে যে তারা প্রাথমিক স্তরেই অনেক টাই পরিনত। শিশুদের ভিশন মিশণ কী হবে বা কী হওয়া উচিৎ তা নির্ধারণের সহায়তা প্রদানে দরকার অতি উচ্চ মার্গের চেতনা সম্পন্ন শিক্ষক ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি। তাই সঙ্গত কারনেই দেশের সর্বোচ্চ মেধাবী জনগোষ্ঠিকে এখানে নিয়োজিত করা দরকার।

কয়েকদিন আগেও এই ধারণাটি বদ্ধমুল ছিল যে প্রাথমিক স্তরের সিলেবাস পড়ানোর জন্য এস এস সি ও এইচ এস সি পাশধারী শিক্ষক হলেই যথেষ্ট। অনার্স সহ মাস্টাস বা তার সমমান ডিগ্রিধারীদের প্রয়োজন তেমন নেই। দেরিতে হলেও প্রাথমিক শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা উন্নীত করা হয়েছে যদিও তা যথেষ্ট নয়। কারণ সিলেবাস শেষ করা আর জাতির ভবিষ্যত বিনির্মাণের ভিত্তি গড়া যদি একই সমান্তরালে বা মোটা দাগে চিন্তা করা হয় তাহলে তা হবে আত্মঘাতী।

আজ সমাজে যে রকম চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, রাহজানি, ইভটিজার, বখাটেদের দৌরাত্ম ও বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার দায়ভার অনেকটা সিলেবাস সর্বস্ব যান্ত্রিক পড়াশুনাকেই নিতে হবে। সহজ সরল সিলেবাসের মধ্যে যে অন্তর্নিহিত ভাব, চেতনা, নীতিবোধ ও দেশপ্রেম সুপ্ত অবস্থায় আছে তা খোঁজে শিশুর কচি মনকে নাড়িয়ে দেয়া বা অনুসন্ধিৎসু করার কৌশল বা ক্ষমতা কেবল দার্শনিক বোধ ও উচ্চ চেতনা সম্পন্ন শিক্ষিত জনশক্তির পক্ষেই সম্ভব। স্থুল চেতনা ও স্বল্প জ্ঞান সম্পন্ন চাকুরীজীবী শিক্ষকের কাছ থেকে তা প্রত্যাশা করা বাতুলতার নামান্তর।

জাতির ভিশন যদি অটুট থাকে তাহলে প্রাথমিক স্তর নিয়ে এত অবহেলা কেন?

উন্নত বিশ্বের সর্বোচ্চ মেধাবীরা বেছে নেয় প্রাথমিক শিক্ষা স্তরের পেশা কে। অথচ বাংলাদেশে তার উলটো চিত্র। আমাদের নীতি নির্ধারক মহোদয়গন বিদেশে সফর করে বিলেতী কিছু ধ্যান ধারণা বাস্তবায়নের জন্য প্রায় মেধাহীন জনগোষ্ঠির উপর চড়াও হন- যা অনির্বাযভাবে কিছুদিনের মধ্যেই ব্যার্থ ধারণা হিসেবে বিবেচিত হয়।
একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে- উন্নত বিশ্বে জনবলের সংকটের কারণে তারা বিকল্প প্রযুক্তির উদ্ভাস ঘটিয়ে জনবলের অভাব পূরণ করে সফলতা পাচ্ছে- এটা তাদের দেশের প্রেক্ষাপট। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট তো
ভিন্ন। আমাদের আছে বিশাল জনশক্তি। এখন যদি নীতি নির্ধারকেরা বিদেশী ধারণা “Make It Short” – এ উজ্জীবিত হয়ে জনবল ছাটাই বা জনবল আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অবিচল থাকে, তাহলে তো এ জনশক্তি জাতির বোঝায় পরিনত হবে। লক্ষ লক্ষ বেকার কাজ না পেয়ে জাতি গঠনের পরিবর্তে জাতি ধ্বংসী অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে যাবে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে চরম শিক্ষক সংকট। সরকারি বিদ্যালয়ের পাশের কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ে প্রায় একই সংখ্যার ছাত্রছাত্রীর জন্য চার-পাঁচ গুন বেশি শিক্ষক নিয়োজিত থাকে। আর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক যখন শ্রেণিপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে দৈনিক ছয় থেকে আটটি ক্লাস এর আঞ্জাম দেন তখন তাঁর কাছে কী ই বা শিখন ফল অর্জনের করানোর আশা করতে পারি।

আরও ভিশনবিহীন মনে হয় প্রাথমিকের আনন্দ স্কুল বা সেকেন্ড চান্স প্রকল্প। বর্তমানে যেখানে ৩য় থেকে ৫ম শ্রেণির গণিত ও ইংরেজি যথাযথভাবে পড়াতে অনার্স/ মাস্টার্স ডিগ্রীধারী প্রশিক্ষিত শিক্ষকগণ হিমশিম খেয়ে যান, সেখানে ঝরে পড়া শিশুদের দায়িত্ব নিয়েছেন এস এসসি/ এইচ এস সি পাসধারী ও নাম মাত্র বেতনের শিক্ষক। এই ঝরে পড়া অবাধ্য শিশুদের বুঝিয়ে মুল ধারায় নিয়ে এসে দেশের উন্নয়নে অংশীদার বানানোর উদ্দেশ্য যদি হয় আমাদের নীতি নির্ধারকদের, তাহলে এই প্রকল্পের শিক্ষক নিয়োগ কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

ঠিক একই রকম অবহেলার শিকার শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান উপজেলা শিক্ষা অফিস। প্রতিষ্ঠানটি সেবাদানের পরিবর্তে শিক্ষক হয়রানির প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে। হয়রানির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার দায়ভার কেবল উপজেলা পর্যায়ের ব্যাক্তিবর্গের উপর বর্তায় না। হয়রানির দায়ভার নীতি নির্ধারকদের উপরেও বর্তায়। এখন ও উপজেলা শিক্ষা অফিস সেই ১৯৯৪- ৯৫ সালের কাঠামো, জনবল ও প্রযুক্তি দিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। পরিবর্তন যা হয়েছে তা নিতান্তই অপ্রতুল। অথচ বিগত দুই যুগে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নে বহু প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষা অফিসের কাজের ভলিউম শত গুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষক জাতীয়করণ সহ হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে এবং হচ্ছে। তার বিপরীতে শিক্ষা অফিসের কলেবর এতটুকু ও বাড়েনি। ফলে সেবাগ্রহিতা শিক্ষকগণ প্রত্যাশিত সেবা যথাসময়ে না পেয়ে তাঁদের মধ্যে হতাশা বৃদ্ধি পেয়েছে যার প্রচ্ছন্ন প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে।

শিক্ষকগণের নিরবিচ্ছিন্ন সেবাদান ও পাওনাদি যথাসময়ের মধ্যে পরিশোধ করে মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকল্পে তাঁদেরকে নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ করার বিকল্প নেই। কিন্তু প্রাপ্ত সেবাদি পেতে বিলম্ব, দ্রুত সেবা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অফিসকে ঘুষ প্রদান ইত্যাদি কাজে যখন শিক্ষকদের মন ভেঙ্গে যায় তখন তাঁদেরকে মান সম্মত শিক্ষা প্রদানের তাগিদ দেয়া উপজেলা পর্যায়ের ব্যবস্থাপকগণ নৈতিক অধিকার রাখেন না।

আর যদি ব্যবস্থাপক নিজেই (ইউইও, এ ইউইও) হয়রানির সিন্ডিকেটের নেতৃত্ত্বে থাকেন, তাহলে তো ঐ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার জবাবদিহীতা বলে কিছুই থাকে না। তাই উপজেলা শিক্ষা অফিস কে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের চরম চাহিদা।

প্রবাসী এক আত্মীয়ের কাছে শুনা একটি গল্প দিয়ে শেষ করব- তাঁর এক পরিচিত বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন এবং এতে সে সম্মানিত বোধ করছেন- কারণ টা বোধহয় সহজেই অনুমেয়।

প্রাথমিক শিক্ষা যদি শিক্ষার মূল ভিত্তি হিসেবে সত্যিই ‘মেনে’ নেয়া হয়, তাহলে প্রাথমিকের সকল স্তরে- শিক্ষক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা- প্রবেশ মেধাবীদের জন্য লোভনীয় এবং আত্ম সামাজিক মর্যাদার কারণে যাতে মেধাবীদের পছন্দের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকে তার কার্যকর ব্যবস্থা করা একান্তই প্রয়োজন।

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here