Home মতামত গার্ল ফ্রেন্ড ও লিভ টুগেদার সংস্কৃতি : সমাজ ব্যবস্থা কোন পথে?

গার্ল ফ্রেন্ড ও লিভ টুগেদার সংস্কৃতি : সমাজ ব্যবস্থা কোন পথে?

255
0

মো. মাহমুদ হাসান

বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড, ব্রেকআপ,লিভ টুগেদার শব্দগুলো বাঙালি সমাজ ব্যবস্থায় খুব বেশি দিনের নয়। বিগত এক দশকে এ শব্দগুলো বাংলাদেশের শহুরে নাগরিক সমাজে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, আইন-কানুন, বিধিবিধান কোন কিছুই সামাজিক সংস্কৃতির ইত্যকার শব্দগুলো কে সমর্থন না করলেও এর বিস্তৃতি ঘটছে দ্রুত গতিতে। ডিজিটাল বাংলাদেশের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির এই ধারার বিকাশে সহায়ক ভুমিকা পালন করেছে। এর ক্রমবর্ধমান বিকাশে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যে সাংস্কৃতিক ও মূল্যবোধের সংঘাত তৈরি হচ্ছে তাতে পুরো সমাজব্যবস্থায় ছড়িয়ে যাচ্ছে অবক্ষয়, বিকশিত হচ্ছে অপরাধের সংস্কৃতি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তৈরী হচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ! যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে, পাশ্চাত্যের আধুনিকতার অনুকরণে গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড আর ভদকা সংস্কৃতি বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় বিকশিত হচ্ছে, সেই পাশ্চাত্যে এই সংস্কৃতির রুপটি আসলে কেমন?

প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থায় ই কিছু নিজস্ব রীতিনীতি বিদ্যমান। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় মদ্যপান অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হলেও পাশ্চাত্যে তা আইনসিদ্ধ। ইসলাম ধর্মে মদ-জোয়াসহ যেকোন নেশাকেই হারাম বা পরিপূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও খৃীষ্টীয় বা ক্যাথলিক সমাজে তা আনুষ্ঠানিকতা আর অবকাশের অনুসঙ্গ। তাই পাশ্চাত্য সমাজে রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে এসব কর্মকান্ডকে একদিকে যেমন বৈধতা দিয়েছে অন্যদিকে এর অপব্যবহার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সকল শ্রেণির মানুষের অধিকার কে ও সুরক্ষা দিয়েছে।

আমাদের দেশে তথাকথিত কিছু সংখ্যক ধর্মীয় বক্তা সবসময়ই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পোস্টমর্টেম করে সভামঞ্চ গরম করে তুলেন। সেই সাথে বিনা শ্রমে নানা অনৈতিক উপায়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া নব্য ধনিক শ্রেণী ইউরোপ, আমেরিকার দেশগুলোকে ফ্রি সেক্সের দেশ বলে অভিহিত করেন। তারা ‘ ফ্রি সেক্স’ বলতে অবাদ যৌনাচার কে বুঝিয়ে থাকেন। এরা বিশ্বাস করেন এসব দেশে একদিকে অবাধে মদ খেয়ে মাতাল হওয়া যায়, যখন যাকে ইচ্ছে গার্লফ্রেন্ড/ বয়ফ্রেন্ড বানিয়ে ফূর্তি করে ভোগ বিলাসে মত্ত হওয়া যায়। আধুনিকতার নামে এই তথাকথিত সংস্কৃতিকে বাঙালি সমাজে বিকশিত করতে উঠতি এই নব্য ধনিক শ্রেণী যেন উঠে পড়েই লেগেছে। একযুগ আগেও গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড, ব্রেকআপ শব্দগুলো বাঙালী সমাজ ব্যবস্থার অনুসংগ ছিল না, কিন্তু আজকালকার নগর জীবনের বাস্তবতায় এযেন ব্যাধি রুপেই আবির্ভূত হয়েছে যদিও এর কোন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আইনি স্বীকৃতি নেই। গার্লফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ডের নামে যথেচ্ছাচার আর নানাবিধ মাদকের সমাহারে সামাজিক রীতিনীতি ও প্রচলিত আইন কানুন কে থোড়াই কেয়ার করে গড়ে উঠছে এক দানবীয় সমাজ ব্যবস্থা, যার পরিণতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত দূর্বল নারীসমাজ, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির উঠতি বয়সের তরুণ তরুণীরা। নৈতিক সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে একটি আদর্শ সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে সামাজিক অস্থিরতা ই বাস্তব হয়ে উঠছে।

একটি পাশ্চাত্য সংস্কৃতির দেশে আমার দেড় যুগের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় যে অর্থে গার্ল ফ্রেন্ড, বয়ফ্রেন্ড আর লিভ টুগেদারের সংস্কৃতি চালু হয়েছে তার কোন বাস্তব উপস্থিতি পাশ্চাত্য সমাজে নেই। কোন নারী যদি ৯১১ এ ফোন করে বলেন আমার পাশে দাড়ানো লোকটির চাহনিতে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি, তাহলে সেক্সুয়াল হেরেসমেন্টের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির গ্রেফতারে কোনভাবেই আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগে না, আর অবাধ যৌনাচার এতো এক অলীক কল্পনা। বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড শব্দগুলো শুধু বিশেষ সম্পর্কের ভিত্তেতেই প্রতিষ্ঠিত এবং পূর্ণ বয়স্ক নর নারী এই সম্পর্কের ভিত্তিতে একত্রে বসবাস করাও আইনসিদ্ধ। বিশ্বাস যোগ্যতার সাথে যে কোন রকম যৌন হয়রানি ব্যতিত একবছরের বেশি একত্রে বসবাস তাদের একে অপরের স্থাবর / অস্থাবর সম্পত্তির উপরও পূর্ণ অধিকার (৫০%) কে প্রতিষ্ঠিত করে। অন্যদিকে কোন ব্যক্তি যদি আইনি উপায়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ব্যতিত বয়ফ্রেন্ড / গার্লফ্রেন্ডের নামে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত হয় তবে প্রতারণাসহ নানা ফৌজদারী অপরাধে ন্যুনতম সময়ে গ্রেফতারে হন। এ ধরনের গ্রেফতারে কোন লিখিত অভিযোগ নয় শুধুমাত্র একটি ফোনকলই যথেষ্ট। কোন ধরনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিপত্তিই অপরাধীকে আইনের মুখোমুখি করা থেকে বিরত করার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে নেই।

কানাডা বহুজাতিক সংস্কৃতির দেশ। নানা ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে এই বহুজাতিক সমাজ টি প্রতিষ্ঠিত। আর আইনের মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থার এই বহুজাতিক সংস্কৃতির রীতিনীতি কে ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। এখানে যেমন প্রতিটি নাগরিক তার নিজস্ব ধর্ম কে বাধাহীন উপায়ে পালন করতে পারে, তেমনি সামাজিক রীতিনীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ও স্বযত্নে লালন করতে পারে। খৃষ্টীয় বা ক্যাথলিক সমাজ মদ্যপান, গার্লফ্রেন্ড ও লিভ টুগেদার এর মতো সংস্কৃতিকে গ্রহণ করলেও বিশেষ ব্যতিক্রম বাদে মুসলিম জনগোষ্ঠী এই সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেই নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। প্রিয় বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় মদ ও নানাবিধ নেশাদ্রব্যের অপব্যবহারে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন যখন অসহনীয় হয়ে উঠছে, সেই সময়ে পাশ্চাত্য সমাজ মাদকের অপব্যবহার কে নিয়ন্ত্রণ করে সামাজিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠছে, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স প্রতিরোধে যুগোপযোগী আইন পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

এ বছরই বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করেছে। পাঁচ দশক আগে জন্ম নেয়া এ দেশ টি অর্ধেকের ও বেশি সময় সামরিক শাসক ও সামপ্রদায়িক অপশক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। গত দেড় যুগে দেশটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করলেও সামাজিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অনেক নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরী হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে উগ্রবাদী নেতা মামুনুল হক ও বসুন্ধরার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নারী কান্ড সামাজিক অস্থিরতারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। একজন সারাজীবনের ইসলামি মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রীয় রীতিনীতি কে উপেক্ষা করে বিবাহিত স্ত্রীর অধিকার কে বঞ্চিত করে দু’জন মহিলার সংগে লিভ টুগেদার করেছে, অন্যজন প্রবল অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করে, বিবাহিত স্ত্রী, সন্তান থাকা সত্বেও একুশ বছরের তরুণীকে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, অকাল মৃত্যুর মাধ্যমে যার যবনিকাপাত ঘটেছে। এ দুটো জঘন্যতম ঘটনা কোন ভাবেই আমাদের সমাজ সংস্কৃতিতে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত ক’দিনের সংবাদ পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট প্রচলিত রীতিনীতি, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধে আর আইন কানুন কে উপেক্ষা করে দ্রুত গতিতে ই বিকশিত হচ্ছে গার্ল ফ্রেন্ড আর লিভ টুগেদারের এই উদ্ভট সংস্কৃতি।

অবৈধ উপায়ে দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার এমন অবারিত সুযোগ পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। তাই তো ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন কে অবজ্ঞা করে এই বিত্তশালীদের বাড়ির বিশালাকৃতির ফ্রিজে শোভা পায় ফ্রান্স, জার্মানীর দামী পানাহার ‘ভদকা’!! এই ভদকায় বুদ হয়ে স্ত্রী সন্তানদের সামনে ই বেসামাল হয় বাড়ির পুরুষ কর্তা টি। এক সময় সন্তানের মা বিবাহিত স্ত্রীকে বড়ই বেমানান মনে হয়। অর্থ, বিত্ত আর ক্ষমতার কৌশলী ব্যবহার দিয়ে সম্মান আর ভোগের প্রতিক হিসেবে জোগাড় করেন গার্লফ্রেন্ড, কোন কোন সময় বাবাকে অনুসরণ করে সন্তানেরাও বেসামাল হয়ে উঠেন। বাড়ির গৃহবধূ টি হ্রদয়ের রক্তক্ষরণ নিয়ে একটি জড় পদার্থের মতোই সারাক্ষণ দগ্ধ হতে থাকেন। এক সময়ে পরিবার টি হয়ে উঠে সমাজ সংস্কৃতি ও আইনের শাসনের জন্য এক চরম হুমকি। পরিবার থেকে পরিবারে বিকশিত এই সংস্কৃতি একদিন সুস্থ সমাজ ব্যবস্থার পথেও হয়ে উঠে এক বিরাট অন্তরায়।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা অনেক অসাধ্য কে ই সাধন করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যা আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতির শাপমোচন করেছেন। নিজ দলের ক্যাসিনো নায়কদের বিচার করে সুস্থ ধারার নেতৃত্ব বিকাশের পথকে উম্মুক্ত করেছেন। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মতো মহা পরাক্রমশালী আর জামাত নেতা, অগাধ বিত্ত বৈভবের মালিক যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে জাতীয় স্বার্থে নির্ভীকতার প্রমাণ দিয়েছেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সকল ষড়যন্ত্র কে উপেক্ষা করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সুখী, সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বাস্তবায়নে অবিরাম নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর ই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা। জাতি বিশ্বাস করে যে সকল অর্থনৈতিক আর সামাজিক দূর্বৃত্ত ধর্মীয় অনুশাসন,প্রচলিত আইন কানুন আর সামাজিক রীতিনীতি কে উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে তথাকথিত গার্লফ্রেন্ড আর লিভ টুগেদার সংস্কৃতির ধারক হয়ে উঠেছে আইনের মাধ্যমে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করে তিনি বঙ্গবন্ধুর আমৃত্যু লালিত স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপায়িত করবেন।

লেখক: কলামিস্ট, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here