Home বিশ্ববিদ্যালয় দুর্নীতির প্রমাণ মেলে, তবু শাস্তি হয় না ভিসিদের

দুর্নীতির প্রমাণ মেলে, তবু শাস্তি হয় না ভিসিদের

25
0


সাব্বির নেওয়াজ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক আবদুস সোবহানের বিষয়ে তদন্ত করে ২৫ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সরেজমিন দু’দফায় তদন্ত করে গত বছরের ২০ ও ২১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল ইউজিসির তদন্ত দল। তদন্ত প্রতিবেদনে প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের জন্য উপাচার্যের সঙ্গে আরও দুই ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়। তারা হলেন- উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) চৌধুরী মো. জাকারিয়া ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুল বারী। এ তিনজনসহ কয়েকজন শিক্ষক এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল সবার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের সুপারিশও করেছিল ইউজিসি।

প্রতিবেদন দেওয়ার সাত মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো ভিসি আবদুস সোবহান শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির এখতিয়ার ও কর্তৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। ভিসি পদে চার বছর মেয়াদ পূর্ণ করে তিনি আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৬ মে) বিদায় নিচ্ছেন। এ সরকারের আমলে তিনি দুই দফায় আট বছর ভিসি থাকলেন।

অধ্যাপক সোবহান বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। বয়স ৬৫ বছর উত্তীর্ণ হওয়ায় তিনি ২০১৭ সালের ২১ জুন চাকরি থেকে অবসরে যান। অবসরে যাওয়ার আগের মাসে ৭ মে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।
অধ্যাপক সোবহানের মতো দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে গত চার মাসে মেয়াদ শেষ করেছেন আরও অন্তত দুইজন ভিসি। মঞ্জুরি কমিশন তদন্ত করে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তা নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, তবু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এমন ভিসির সংখ্যা অনেক। ইউজিসির তথ্যমতে, দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৫০টি। এর মধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে অথবা শেষ হয়েছে। ১৪ জনের তিনজন এরই মধ্যে মেয়াদপূর্তি শেষে বিদায় নিয়েছেন।
ভিসিদের দুর্নীতির প্রমাণ মেলে, কিন্তু বিচার ও শাস্তি হয় না কেন- জানতে চাইলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, যারা ব্যবস্থা নেবেন তাদের মধ্যে অনাগ্রহ রয়েছে। আবার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও থাকে। এটাই বাস্তবতা। অথচ সদিচ্ছা থাকলেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, দুর্নীতির প্রমাণ হওয়ার পরও ভিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক ক্ষতি হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এমন অনেক ব্যক্তিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার একাডেমিক, প্রশাসনিক ও নৈতিক যোগ্যতা নেই ভিসি হবার মতো।
ইউজিসির তদন্তে পূর্ত কাজে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর বিরুদ্ধেও। তিনিও ইউজিসির তদন্তের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বক্তব্য দেন। অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর চার বছরের মেয়াদ এ মাসেই শেষ হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদায়ী ভিসি আবদুস সোবহান শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা শিথিল করে নিজের মেয়ে ও জামাতাকে নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে ৩৪ জন অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি ১৮ মাস ধরে নানা অজুহাতে দখলে রাখেন। এ বাড়ির ভাড়া বাবদ তার কাছ থেকে পাঁচ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা আদায়ের সুপারিশ করা হয় ইউজিসির প্রতিবেদনে।
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শহীদুর রহমান খান তার নিজের ছেলেকে অস্থায়ী ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা কর্মকর্তা বা সেকশন অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। মেয়েকে নিয়োগ দিয়েছেন শিক্ষক হিসেবে। অধ্যাপক পদে তার স্ত্রীও আবেদন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির সিন্ডিকেটের পাঁচজন সদস্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে ইউজিসি।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এম এ মাননান তার ছেলেকে শিক্ষক পদে নিয়োগ দিতে একাধিক যোগ্যতা শিথিল করেন। তার ছেলে জাহেদ মাননান ২০১৬ সালের শেষ দিকে বাউবিতে সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদন করলে নির্ধারিত যোগ্যতা না থাকায় আবেদন বাতিল হয়। কিন্তু এক বছর পার হওয়া মাত্রই ২০১৮ সালে তার ওই ছেলেই সহযোগী অধ্যাপক পদ বাগিয়ে নেন। গত ২৩ মার্চ এই ভিসি বিদায় নিয়েছেন। ভিসি তার শ্যালিকা, একাধিক আত্মীয় এবং তার নিজ এলাকা কুমিল্লার শতাধিক ব্যক্তিকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শেকৃবি) সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়মের ব্যাপারে এখনও তদন্ত করছে ইউজিসি। ২০১৭ সালে ৭৫ জন শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও পরে ১০১ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কৃষিতত্ত্ব বিভাগে নিয়োগ বোর্ডে বিশেষজ্ঞ হিসেবে ভিসির জামাতা ও বিভাগের অধ্যাপক ড. মির্জা হাসানুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সংশ্নিষ্টরা জানান, ভিসি তার আপন ভাগনে মো. মাহবুব আলমকে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগ প্রদানের জন্যই জামাতাকে বিশেষজ্ঞের পদে বসান।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষক সমিতি গত ১৪ মার্চ ইউজিসিতে ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা দেন। সেখানে বলা হয়েছে, উপাচার্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অমান্য করে পিএইচডি ডিগ্রিহীন ৩৫ বছরের অধিক বয়সী ফিরোজ কবিরকে শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ দিয়েছেন। এরপর ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ খুলে এই বিভাগের চেয়ারম্যান পদে ফিরোজ কবিরকে নিয়োগ দিয়েছেন। ফিরোজ কবিরের স্ত্রীকেও এই বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যার বয়সও ৩০ বছরের বেশি। এছাড়া মেডিকেল অফিসার ও সহকারী স্টোর কিপার পদে অস্বচ্ছভাবে নিয়োগ দিয়েছেন। এই ভিসি এ মাসেই মেয়াদ শেষে বিদায় নেবেন।
ইউজিসির তদন্ত চলছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও (সিকৃবি)। গোপালগঞ্জে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক খোন্দকার নাসির উদ্দিন নিয়োগে নানা অনিয়ম করেছেন বলে ইউজিসির তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। ছাত্র আন্দোলনের মুখে এই ভিসি পদত্যাগ করেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া ভিসিদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) একেএম আফতাব হোসেন প্রামাণিক সমকালকে বলেন, অনিয়ম করে কারোরই পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার প্রয়োজন পড়ে। অনেক সময় সেই প্রক্রিয়ায় কিছু সময় লাগে। সময় লাগাটা স্বাভাবিক।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ভিসিদের অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা সমাজের সার্বিক চিত্রের একটি প্রতিফলন। একজন ভিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার জন্য দৃষ্টান্ত হওয়ার কথা। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, প্রবল দলীয়করণের কারণে যোগ্যরা ভিসি হতে পারছেন না। যারা হচ্ছেন, তাদের অনেকে সম্মান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষর চেয়ে নিজের আর্থিক লাভালাভের বিষয়টি বড় করে দেখছেন।

সূত্র: সমকাল

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here