Home বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনাকাটায় দুর্নীতি: ২০ টাকার পাইপ ৫০০...

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনাকাটায় দুর্নীতি: ২০ টাকার পাইপ ৫০০ টাকা!

51
0

তৌফিক মারুফ ও শরীফুল আলম সুমন

খামার, নার্সারি, ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে পানি দেওয়ার জন্য চিকন হোসপাইপ ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে যেকোনো পাড়া-মহল্লার স্যানিটারি অথবা হার্ডওয়্যারের দোকানেই হোসপাইপ পাওয়া যায়। প্রতি ফুটের দাম সাধারণত ১৮ থেকে ২০ টাকা। কিন্তু গাজীপুরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরকৃবি) গবেষণা খামার লাইভস্টক অ্যান্ড পোল্ট্রি ফার্মের জন্য সেই হোসপাইপ কিনতে বরাদ্দ রাখা হয় প্রতি ফুট ১৩৩ টাকা করে। তা সত্ত্বেও প্রতি ফুট কেনা হয়েছে ৫০০ টাকা করে।

শুধু হোসপাইপই নয়, এই খামারের জন্য সিমেনস ফ্রিজার, মিল্ক প্যাকেজিং মেশিন, প্রেগন্যান্সি ডিটেক্টর, ক্রিম সেপারেটরসহ নানা সরঞ্জাম কেনা হয়েছে কয়েক গুণ বেশি দামে। কিন্তু এর পরও এখনো ফার্মটি চালু করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রক্রিয়া থেমে গেলেও একটি ইনস্টিটিউটের জন্যই কেনা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার মালপত্র। ইনস্টিটিউট না হলে এগুলো কী কাজে লাগবে, তা জানে না কেউ।

এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের জন্য মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৭ সালে প্রায় ৩৭৫ কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়। সেই তিন বছর শেষ হওয়ার পর এখন বর্ধিত সময়েও কাজ চলছে কচ্ছপগতিতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের হিসাবেই ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. গিয়াস উদ্দিন মিয়া বলেন, লাইভস্টক অ্যান্ড পোল্ট্রি ফার্মে কত টাকার জিনিসপত্র কেনা হয়েছে, তা কাগজপত্র দেখে বলতে হবে। তিনি বলেন, ‘একটি ইনস্টিটিউটের জন্য আমরা কিছু যন্ত্রপাতি কিনেছিলাম। কিন্তু ইনস্টিটিউট না হলেও সেই যন্ত্রপাতি সেন্ট্রাল ল্যাবে কাজে লাগছে। যেহেতু জিনিসপত্র কেনার একটা সময়সীমা থাকে, সে জন্যই আমরা কিনেছি। আমাদের গবেষকরা সেই যন্ত্রপাতি দিয়ে নিয়মিতই গবেষণাকাজ চালাচ্ছেন। আর এ জন্যই তো আমরা র্যাংকিংয়ে দেশসেরা হতে পেরেছি।’

উপাচার্য আরো বলেন, ‘ভিসি হিসেবে আমার চার বছরের মেয়াদ আগামী জুনে শেষ হবে। সরকার আমাকে দ্বিতীয় মেয়াদে রাখার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করছে। আর এ জন্যই কিছু শিক্ষক, যাঁরা নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন না তাঁরা নানা ধরনের কথা বলছেন। আপনাদেরও (সাংবাদিক) বলতে পারেন। তবে আমি শতভাগ স্বচ্ছ আছি। আপনারা (সাংবাদিক) বিশ্ববিদ্যালয়ে আসুন, আমি সব কাগজপত্র আপনাদের দেখাব।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মহাপরিকল্পনার ৬৫ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে বলে জানান উপাচার্য।

কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘তিন বছর মেয়াদের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করতে পারিনি। যৌক্তিক কারণেই মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত আনুমানিক ২০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। তবে বিভিন্ন কারণে কাজে এখন ধীরগতি।’

জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইভস্টক অ্যান্ড পোল্ট্রি ফার্মের হোসপাইপ কেনার জন্য দুই লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যাদেশে দেখা যায়, এক হাজার ৫০০ ফুট হোসপাইপ কেনার জন্য প্রতি ফুট ৫০০ টাকা হিসাবে সাত লাখ ৫০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। সিমেনস ফ্রিজারের জন্য পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা বাড়িয়ে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ছোট আকারের মিস্ত পাথুরাইজার ও মিড হোমোজিনাইজারের জন্য আড়াই লাখ টাকা করে পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা করে মোট সাত লাখ ২০ হাজার টাকার। মিল্ক প্যাকেজিং মেশিনের জন্য এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া থাকলেও কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে তিন লাখ ৭০ হাজার টাকার। প্রেগন্যান্সি ডিটেক্টরের দাম এক লাখ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। ক্রিম সেপারেটরের দাম দেড় লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে দুই লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত সুবিধাদি ও গবেষণা সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ’ নামের ওই প্রকল্পের অধীনে লাইভস্টক অ্যান্ড পোল্ট্রি ফার্মের শুধু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই উপাচার্য গিয়াস উদ্দিন মিয়া তৎকালীন ফার্ম ইনচার্জকে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরিয়ে দেন। দায়িত্ব পান উপাচার্যের আস্থাভাজন কিন্তু ফার্ম পরিচালনায় অনভিজ্ঞ একজন শিক্ষক। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই নতুন ফার্ম ইনচার্জ আইটেমের সংখ্যা ঠিক রেখে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি কেনার মূল প্রকল্পে বরাদ্দ করা অর্থের পরিমাণ পরিবর্তন করে কার্যাদেশ দেন।

প্রকল্পটির অধীনে ‘ইনস্টিটিউট অব ফুড সেফটি অ্যান্ড প্রসেসিং’ ও ‘ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট চেঞ্জ’ নামে দুটি ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয় এবং এসংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স তৈরির উদ্দেশ্যে একাডেমিক কাউন্সিল কমিটিও গঠন করা হয়। বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর ইনস্টিটিউট স্থাপনের প্রক্রিয়া থেমে গেলেও কেনা হয়েছে কোটি কোটি টাকা দামের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র। প্রকল্প প্রস্তুতকালে যেসব বিশেষজ্ঞ শিক্ষক এই ইনস্টিটিউটের প্রস্তাব তৈরি করেছেন, যন্ত্রপাতি কেনার সময় তাঁদের কাউকে রাখা হয়নি। শুধু ইনস্টিটিউট অব ফুড সেফটি অ্যান্ড প্রসেসিংয়ের নামেই ২০১৮ সালে একটি কার্যাদেশের মাধ্যমে কেনা হয়েছে চার কোটি ৫৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকার সরঞ্জাম।

জানা যায়, ৩৭৫ কোটি টাকার ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত সুবিধাদি ও গবেষণা সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয় ২০১৭ সালে। এই প্রকল্পেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদকে পরিচালকের (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখা হয়। ফলে একই ব্যক্তি পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) হিসেবে টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরি করছেন, প্রাপ্ত টেন্ডার মূল্যায়ন করছেন আবার তিনিই কোষাধ্যক্ষ হিসেবে বৃহৎ ও স্বল্প মূল্যের ক্রয় কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কাকে কাজ দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। এখন কোষাধ্যক্ষকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক (ছাত্রকল্যাণ) পদে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে কোষাধ্যক্ষ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সরকার আমাকে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্ব দেওয়ায় তা আমি পালন করেছি মাত্র। তবে এখন আর আমি এই দায়িত্বে নেই।’

সূত্র জানায়, বেশি দামে কার্যাদেশ দিলেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। এরপর ফার্ম ইনচার্জকে আহ্বায়ক করে তড়িঘড়ি করে যন্ত্রপাতি বুঝে নেওয়ার জন্য কমিটি গঠন করা হলেও তারা নিম্নমানের সামগ্রী বুঝে নিতে রাজি না হওয়ায় বিপাকে পড়ে যায়। তার পর থেকে মাসের পর মাস ধরে চলছে নানা ধরনের কৌশল আর কমিটি গঠন। চলছে পারস্পরিক দোষারোপও। ফলে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে ফার্মের কাজ। শুধু যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়মই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের জন্য একটি পাজেরো এবং একটি টয়োটা অ্যাভেঞ্জা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের টাকায় একটি নতুন মিত্সুবিশি পাজেরো স্পোর্টস এবং একটি টয়োটা রাশ কেনা হয়েছে। গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও জ্বালানির ব্যয় খাতে চলছে ব্যাপক অনিয়ম। এসব কারণে প্রতিবছর পরিবহন খাতে কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর টহলের গাড়িটি বানিয়ে ফেলেছেন ‘ফ্যামিলি কার’। অথচ তেল খরচ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকেই।

এ ছাড়া নতুন কম্পিউটার যন্ত্রাংশ ও নেটওয়ার্কিংয়ের যন্ত্রাংশ কেনার নামে আগের পুরনো যন্ত্রাংশ ব্যবহার করেও বিল-ভাউচার করার অভিযোগ রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ফলে নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ভেঙে পড়লে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখার কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক রাতের মধ্যেই গোপনে মেরামত করা হয়।

সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here