Home মতামত বাংলা ভাষার বিকৃতি আর কত কাল চলবে?

বাংলা ভাষার বিকৃতি আর কত কাল চলবে?

51
0

ব্যারিস্টার এম এ কবির ইমন

আমরা জানি, ভাষার পরিবর্তন বা বিবর্তন প্রত্যেকটা ভাষার সহজাত ধর্ম। কিছু অর্জন ও কিছু বর্জনের মাধ্যমে ভাষার বিবর্তনে ভাষা সজীব ও সচল ভাষায় রূপান্তরিত হয়, যা জীবন ও তৃণমূলের ধর্মমতোই এগোতে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিবর্তন বা বিবর্তন আর বিকৃতি কি এক ?

পরিবর্তন ও বিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কৃতি মানসিকতা আরো উর্বর হবে, এটাই স্বাভাবিক। মানুষের সহজাত কষ্টবিমুখ প্রবণতাই কোনো কিছুর কারণ বা ভাবনা থেকে সরে সহজলভ্য বা সহজতরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। প্রত্যেক ভাষার বিবর্তনের উদ্ভবের পেছনে এই কারণটিই সক্রিয় বলে প্রতীয়মান। তাই আজকের প্রজন্ম সাধু ভাষাকে পুরোপুরি বর্জন করে কথ্য বা চলিত ভাষাকে আপন করে নিয়ে কোন মাপকাঠিহীন রূপান্তরে ধাবিত হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। আমাদের এই তথ্যপ্রবাহের যুগে সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের বাংলা ভাষা ব্যবহার কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, তা রীতিমতো গবেষণাযোগ্য। এটা কি ভাষার বিবর্তন না বিকৃতি? যদি বিকৃতি হয়, তাহলে এর লাগাম টেনে ধরা কি উচিত নয়?

সাধু ভাষা বাংলা ভাষার অপেক্ষাকৃত প্রাচীন রূপ। এর নবীন ও বর্তমানে বহুল প্রচলিত রূপটি হলো চলিত। সাধু ভাষা অনেকটা ধ্রুপদি বৈশিষ্ট্যের এবং চলিত ভাষা অপেক্ষাকৃত স্বল্প প্রাঞ্জল। ‘সাধু’ শব্দের এক অর্থ শিষ্ট, মার্জিত বা ভদ্র রীতিসংগত। তারই ধারাবাহিকতায় রাজা রামমোহন রায় তার ‘বেদান্ত গ্রন্থ’ রচনাটিতে বলেছেন যে, সাধু ভাষার সঙ্গে প্রমিত বা চলিত ভাষার মিশ্রণ দূষণীয় এবং লেখার সময় যে কোনো একটি রীতিকে গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়, তা না হলে একে ‘গুরুচণ্ডালী’ দোষে দুষ্ট আখ্যা দেওয়া যায়। বর্তমান সামাজিক মাধ্যমে যেভাবে বাংলা ভাষার ব্যবহার চলছে, তা দেখলে রাজা রামমোহন রায় হয়তো কিছু বলার ভাষাই খুঁজে পেতেন না। কারণ এই ভাষা না সাধু না চলিত, এমনকি গুরুচণ্ডালীর মধ্যেও পড়ে না। বাংলা ভাষার এই ব্যবচ্ছেদ, যা বিশ্বের অন্য কোনো জাতির ভাষায় দেখা যায় না।

ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘সাধারণ গদ্য-সাহিত্যে ব্যবহূত বাঙ্গালা ভাষাকে সাধু ভাষা বলে।’ এছাড়াও তিনি এ ভাষাকে সমগ্র বঙ্গদেশের সম্পত্তি বলে আখ্যায়িত করেছেন। চলিত ভাষা সর্বদাই নতুন নতুন ধ্বনি পরিবর্তন করে। কিন্তু সাধু ভাষায় শব্দের রূপান্তর তেমন দেখা যায় না। যেমন, চলিত ভাষায় স্বরসংগতি ও অভিশ্রুতির প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কিন্তু সাধু ভাষায় তেমনটা দেখা যায় না। চলিত ভাষা অপেক্ষাকৃত চটুল এবং সাধু ভাষা গম্ভীর; তবে ব্যঙ্গরচনা বা রম্যরচনায় চলিত ভাষার মতো সাধু ভাষারও সফল ব্যবহার হতে পারে। তবে সাধু ভাষায় আছে একধরনের স্বাভাবিক আভিজাত্য ও ঋজুতা। কিন্তু আমরা এই আভিজাত্য থেকে দিনে দিনে বিচ্যুতির দিকে যাচ্ছি এবং তা নিয়ে কারো কোনো অনুযোগ বা অভিযোগ নেই। যেন এটাই স্বাভাবিক।

এ যুগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ দেশীয় পণ্ডিতদের লেখার ভঙ্গিই সাধু ভাষার আদর্শ রূপ ধরে নেওয়া হয়। আমাদের সাহিত্যে বর্তমানে সাধু ভাষার ব্যবহার তেমন নেই বললেই চলে। তবে কিছু পুরাতন কাগজসমূহে সংস্কারের অভাবে সাধু ভাষা রয়ে গেছে এবং সেগুলো পুনর্মুদ্রণ না করায় এমন ঘটেছে। যেমন: জমির দলিলে এখনো সাধু ভাষা দেখতে পাওয়া যায়। তবে সাধু ভাষা যে একসময় অব্যবহূত হয়ে পড়বে তা দূরদর্শী লেখকগণ আগেই অবহিত করার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, রূপকথায় বলে—এক যে ছিল রাজা, তার ছিল দুই রানি, সুয়োরানি আর দুয়োরানি। তেমনি বাংলা বাক্যাধীপেরও আছে দুই রানি—একটাকে আদর করে নাম দেওয়া হয়েছে সাধু ভাষা আর একটাকে কথ্য ভাষা, কেউ বলে চলতি ভাষা, আমার কোনো কোনো লেখায় আমি বলেছি প্রাকৃত বাংলা। রবীন্দ্রনাথ আভিজাত্যের জন্য সাধু ভাষাকে সুয়োরানির সঙ্গে তুলনা করেছেন কিন্তু পরিণতিতে এর বিলুপ্তির কথাও বলেছেন। রূপকথায় শুনেছি, সুয়োরানি ঠাঁই দেয় দুয়োরানিকে গোয়ালঘরে। কিন্তু গল্পের পরিণামের দিকে দেখি সুয়োরানি যায় নির্বাসনে, টিকে থাকে একলা দুয়োরানি রানির পদে।

আমরা সংস্কৃত বলতে যদি সংস্কারই বুঝি, যা ভাষাকে ঘষে মেজে এক পরিপূর্ণতা এনে দেয়, তাহলে তার দিকে সহজাত মানুষের আকৃষ্ট হওয়ার কথা। কিন্তু আজ তা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কোথায় যেন একটি গোলমাল বেধে আছে। যেমন ধরুন, অনুরুদ্ধ ভট্টাচার্যের কথা অনুসারে একটি পুরোনো বাসাকে ভেঙে নতুন করে ঘষে মেজে সংস্কার করে পরিচ্ছন্ন করার মতোই সংস্কৃতির কাজ। হাজার হাজার বছর ধরে বিভিন্ন ভাষাভাষির রাষ্ট্র বা রাজ্য পরিচালনায় একটি বিরাট প্রভাব রয়েছে এই বাংলা ভাষায় এবং এরই মাধ্যমে ভাষার বিবর্তন ঘটেছে। তবে বাংলা ভাষা কি অভিজাতদের ভাষা, না সাধারণের ভাষা, তা নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক, আলোচনা। এখন সাধু এবং চলিতকে কি একটি রূপে আনা সম্ভব বা করা দরকার বলে আমাদের মনে হয়? যা কিনা বাংলা ভাষাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলবে। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ যত দিন বেঁচে থাকবে বাংলা ভাষা তত দিন গর্ব নিয়ে এগোবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আজ বাংলা ভাষা বিশ্বে সমাদৃত। বাংলা ভাষাকে ‘সুইটেস্ট ল্যাংগুয়েজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ বলা হয়ে থাকে। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আমাদের ভাষার এক অনন্য গর্ব। সেনেগাল ও সিয়েরা লিওনে বাংলা ভাষাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বাংলা ভাষার অর্জন অনেক। প্রায় ৫০ কোটি মানুষ এখন এই পৃৃথিবীতে বাংলা ভাষাভাষী এবং এত সব অর্জনের পরও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই ভাষা কি জনগণের ভাষা, না অভিজাত লোকের ভাষা। নাটোরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলন যেখানে অনুষ্ঠিত হতো, সেখানে বড় বড় পণ্ডিত এসে ইংরেজিতে বক্তব্য দিতেন। একবার কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বললেন, না, তিনি এই সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা দেবেন এবং তা-ই হলো। কিন্তু বক্তব্যের পরে এখানে উপস্থিত বঙ্গীয় পণ্ডিত রনেস চন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে বললেন, ‘ণড়ঁত্ পযধপযধ ইঁংযব পধহ ঁহফবত্ংঃধহফ ুড়ঁত্ ইধহমষধ গত্. ঞধশঁত্’

এ থেকে এই অনুধাবন করা যায় যে, বাংলা ভাষার রসটা অভিজাত লোকদের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এই ভাষা কখনো সাম্প্র্রদায়িক কখনো সাধারণের বা মাপকাঠিহীন আধুনিক চলতি ভাষাভাষীর, অর্থনৈতিক অন্ত বিস্মরণকারীর, পুঁজিবাদীর, সংকর জাতীয়, হীনম্মন্য দলের, পোস্ট কলোনিয়াল রাষ্ট্রের, অভিজাত শ্রেণির, এসবের প্রভাব কি সাধু ভাষাকে বিলুপ্ত করে চলতি ভাষাকে মাপকাঠির ঊর্ধ্বে নিয়ে বর্তমান বাংলা ভাষা এগোচ্ছে? এই সম্ভাবনাকে বাঙালা ভাষার পণ্ডিতগণ অতীতে অনুধাবন করলে মৌলিক ভাষার এই বিভাজন হয়তো হতো অন্য রকম। শত শত বছর বিভিন্ন অভিজাত জাতি বাঙালিকে শাসন করেছে—যে শাসক, তারা মূলত অর্থনৈতিক ও শিক্ষাদীক্ষায় অগ্রসর, অভিজাত যা বাংলা ভাষাভাষীদের মূল বাঙালির ভাবনাকে দুর্বল করে দিয়েছে, তা আজ বাঙালি নিজ ভাষার স্থলে অন্য ভাষার প্রভাবকে যে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে—এ থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে গায়ের জোরে শুধু ব্যবহার করছি না, উদ্যাপন করে ব্যবহার করছি কিন্তু আপত্তি করছি না। আসলে বাংলা ভাষাকে আমরা একটি অসম্মানিত ভাষা বা অসম্মানের জন্য ভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছি। শুধু এখন নয়, বহু অতীত থেকে বিত্তের সঙ্গে ‘বাঙালি’ সম্পর্ক আর দারিদ্র্যের সঙ্গে ‘বাঙাল’ সম্পর্ক বেশি বলে, আমরা মনে করি অন্য ভাষা যেমন ইংরেজি, ফারসি, আরবি ও হিন্দি শ্রেষ্ঠ। এটি ঝকঝকে, সমৃদ্ধ এবং এতে বর্তমান জীবন-জীবিকার একটি সহজ সমীকরণ পাওয়া যায়। বাংলার সঙ্গে যেন একটা এদো বা গরিব একটা হেনতেন ভাব লেগে আছে। তাই এখন দেখা যায়, মা ও বাবা অতি উদাসের সঙ্গে বলে উঠে— জানো, আমার ছেলে না বাংলা ভালো করে বলতে পারে না। কিন্তু এই আবেদন যে কত লজ্জার তা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না।

বিশ্বের প্রতিটি দেশেই নিজস্ব ভাষাকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। একটি হচ্ছে সর্বদেশীয় ভাষা, আরেকটি হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা। কিন্তু বাঙালি ভাষা সেই জায়গা থেকে কিছুটা বিচ্যুত। সেখান থেকে বিশ্বের এই নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে বাংলা ভাষার কিছুটা ব্যতিক্রম রয়েছে। যেমন মৌলিক ভাষাকে দুটি রূপ দেওয়া হয়েছে—সাধু ভাষা, চলিত ভাষা এবং অন্যটি হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষা। বাংলা ভাষার এই ব্যতিক্রম আমাদের বর্তমান সংকট, অবাঙালা, বিকৃত মানসিকতার উপসর্গ বলে আমার মনে হয়। এই ভাষা কি সাধারণের না অভিজাতের, হিন্দু না মুসলমানের, না পণ্য বিস্তারের উপভোগের মতো—এত প্রশ্নের উত্তরণ হতো না। অতীতে বিভিন্ন পণ্ডিত সাহিত্যবিশারদের এক অমূলক ভবিষ্যদ্বাণী থাকা সত্ত্বেও আজ বাংলা ভাষার অবাংলা রূপ প্রবল বেগে ছুটছে।

আজকের আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা বা বাংলা ভাষা চর্চার এক বড় মাধ্যম বলে বিবেচিত। কিন্তু ফেসবুকে বাংলা লেখনীর একটি বিধান থাকা খুবই প্রয়োজন। আদি যুগ থেকে পোড়ামাটিতে লেখা, গাছের চামড়ায় লেখা, দেওয়ালে লেখা থেকে শুরু করে অদ্যাবধি যত মাধ্যমই রয়েছে, প্রত্যেকেরই একটি বিধানের মাধ্যমে সম্প্রসারিত হয়েছে। বাংলাদেশে মোবাইল ও স্মার্টফোনের বিস্তার এবং ইন্টারনেটের সম্প্রসারণ বাংলা সংস্কৃতি বিকাশে সহায়তা করবে। দেশে বর্তমানে শতভাগের বেশি মোবাইল ফোনের পাশাপাশি সরকারি হিসেবে ১১ কোটির বেশি জনগোষ্ঠী ইন্টারনেটের আওতায় এসেছে। মহামারিকালে ১৮ লাখ নতুন ব্রডব্যান্ড সংযোগ হয়েছে। কিন্তু আজ বিশ্বে সবচেয়ে বড় মাধ্যম সামাজিক যোগযোগ ফেসবুক, টুইটার, অনলাইন, ইউটিউব, ফেসবুকে বাংলিশ, বাংরেজি চলছে। নতুন প্রজন্ম তাই দেখে দেখে হাততালি দিয়ে বেড়ে উঠবে, তার কোনো বিধান থাকবে না—তা হতে পারে না।

লেখক :আইনজীবী

Print Friendly, PDF & Email
শেয়ার করুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here