নতুন কারিকুলামে চ্যালেঞ্জ - কোচিং বানিজ্য বন্ধ নীতিমালা বাস্তবায়নে কঠোর হতে হবে

নতুন কারিকুলামে কোচিং বাণিজ্য বাড়বে না কমবে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করছেন ইত্তেফাকের সিনিয়র সাংবাদিক নিজামুল হক। এডুকেশন বাংলার পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হলো।

শিক্ষকদের প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্য থেকে দূরে রাখতে ২০১২ সালে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা জারি করে সরকার| এই নীতিমালা জারির মূলত তিনটি কারণ ছিল| ক্লাসরুমের পাঠদান বাদ দিয়ে শিক্ষকদের প্রাইভেট-টিউশনিতে আগ্রহ, যেসব শিক্ষাথী‌র্ শিক্ষকের কাছে টিউশনি-কোচিংয়ে পড়ে না ক্লাসরুমে তার সঙ্গে বিরূপ আচরণ এবং পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার অভিযোগ| কিন্তু এই নীতিমালা জারির ১০ বছরেও বাস্তবায়নের হার শূন্য| ফলে যা হবার তাই হচ্ছে| নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নির্ভরতা বাড়বে| এ কারণে নতুন করে এই নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনায় আসছে| এই কারিকুলামের সাফল্য পেতে এই কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা বাস্তবায়নকে প্রধান্য দিতে হবে| এছাড়া শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে|

 

নতুন কারিকুলামে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন হবে| এদের কোনো বার্ষিক পরীক্ষা হবে না| ৪র্থ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ৬০ শতাংশ শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন এবং ৪০ শতাংশ বার্ষিক পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন হবে| ৯ম ও দশম শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন ও বাকি ৫০ শতাংশ পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে| আর একাদশ-দ্বাদশে ৩০ শতাংশ শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়ন ও ৭০ শতাংশ পরীক্ষারমাধ্যমে মূল্যায়ন হবে| অর্থাত্ শ্রেণিকক্ষেই মূল্যায়নেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে| যা নির্ভর করবে শিক্ষকদের ওপর| যে শিক্ষার্থী ঐ শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট টিউশনি বা কোচিংয়ে পড়বে, এ ক্ষেত্রে ঐ শিক্ষার্থীকে বেশি নম্বর পাওয়ার সুযোগ থেকেই যায়|

 

শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেতে শিক্ষকের বাসায় ভিড় এখনো করছে| নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের পর এই ভিড় আরো বাড়বে বলে মনে করেন অভিভাবকরা| যে শিক্ষার্থী শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট টিউশনি কোচিংয়ে পড়ে তার ফলও ভালো হচ্ছে|

 

অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষকের কাছ থেকে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন পেতে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে| কোনো শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট-টিউশনি পড়ানোর সুযোগ না পেলে সবার ওপরই তার সমান আন্তরিকতা থাকবে| এর মাধ্যমেই নিরপেক্ষ মূল্যায়ন আসবে|

 

আমিরুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, সব শিক্ষক কতটা নিরপেক্ষভাবে এই মূল্যায়ন করবেন, সেটা নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে| শুরুতে এই ধরনের মূল্যায়নে কম নম্বর রেখে বিষয়টি পাইলট আকারে দেখা যেত| বিষয়টিতে সাফল্য পাওয়া গেলে শ্রেণিকক্ষের মূল্যায়নে ধীরে ধীরে নম্বর বাড়ানো যাবে|

 

আজিজুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক জানান, কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা করা হয়েছিল শিক্ষকের কাছে যাতে শিক্ষার্থীরা জিম্মি না থাকে| প্রাইভেট পড়লে শ্রেণিকক্ষে তার সঙ্গে ভালো আচরণ করা হয়| পরীক্ষায় বেশি নম্বর দেওয়া হয়| পরীক্ষা নেওয়া হলে খাতায় রেকর্ড থাকে| কিন্তু শ্রেণিকক্ষ মূল্যায়ন সব সময় কাগজে কলমে থাকবে না| ফলে এই মূল্যায়ন শিক্ষকের ব্যক্তি চিন্তার ওপর নির্ভর করবে|

 

তবে এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি, বিশেষত পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীর মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ মূল্যায়ন করে| তাই প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষা পদ্ধতি বহাল রেখে শিক্ষাক্রমের মূল উদ্দেশ্য অর্থাত্ শিক্ষার্থীর জ্ঞানের পাশাপাশি দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং গুণাবলি ও মূল্যবোধ অর্জন সম্ভব হবে না| তাই পাবলিক পরীক্ষায় সামষ্টিক মূল্যায়নের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের মূল্যায়নের ব্যবস্হা রাখা হয়েছে|