শিরোনাম
  • মেলায় যাই রে...গানটি বিটিভির ‘আনন্দ মেলা’ অনুষ্ঠানে প্রথম উপস্থাপন  ইসরাইলে হামলায় যেসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে ইরান পঞ্চম গণবিজ্ঞপ্তিতে আবেদন শুরু বুধবার চলবে ৯ মে রাত ১২টা পর্যন্ত  আলপনার রঙে রাঙানো হচ্ছে হাওরের ১৪ কিলোমিটার সড়ক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নির্দেশনায় যা আছে সপ্তম শ্রেণির ‌‌বিতর্কিত 'শরীফার গল্প' সংশোধন কতদূর? বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হলো নতুন বর্ষ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ: পহেলা বৈশাখ আজ মুক্তিপণ দিয়েই জিম্মি থাকা ২৩ নাবিক ও এমভি আবদুল্লাহ জাহাজ মুক্ত পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতার দাবিতে পতাকা হাতে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বিক্ষোভ ১০ দেশে অল্প খরচে পড়তে পারেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা
    • উচ্চ শিক্ষা
    • 'যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না তাদের বিশ্ববিদ্যালয় বলা চলে না'

    'যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না তাদের বিশ্ববিদ্যালয় বলা চলে না'

    পিপলস্ ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। তারা প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর পার করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৫টি অনুষদে ১৫টি বিভাগ রয়েছে। তাদের শিক্ষার্থী ২ হাজার ১৯৪ ও শিক্ষক ৭৮ জন। এত পুরনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় ২০২২ সালে গবেষণায় ১ টাকাও খরচ করেনি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজই হলো গবেষণা।

    শুধু পিপলস্ ইউনিভার্সিটিই নয় ২০২২ সালে গবেষণায় ১ টাকাও খরচ করেনি ১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ১ লাখের নিচে খরচ করেছে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়। ১ থেকে ৫ লাখের নিচে খরচ করেছে ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়। আর ৫ থেকে ১০ লাখের নিচে খরচ করেছে ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়।

    ২০২২ সালের তথ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৯তম বার্ষিক প্রতিবেদনে গবেষণার এই দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। ওই বছর ১০০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল।


    সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গবেষণায় যেসব বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচ-দশ লাখ টাকা খরচ দেখিয়েছে, তারা লোকদেখানোর জন্য এটা করেছে। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে তেমন কোনো গবেষণা হয়নি। গবেষণায় বরাদ্দ না থাকলে ইউজিসির চাপ থাকে। সেজন্য তারা কিছু টাকা এ খাতে রেখে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছে। ৫৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে গবেষণা ছাড়াই। 

    শিক্ষাবিদরা বলছেন, বর্তমান বিশ্ব হচ্ছে জ্ঞানভিত্তিক। যারা যত বেশি প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন করতে পারে, তারাই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করে। আর উচ্চশিক্ষার মান বাড়াতে গবেষণা অন্যতম পূর্বশর্ত। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা খাতে প্রচুর টাকা খরচ করে। কিন্তু আমাদের দেশে গবেষণায় যে টাকা খরচ করা হয়, তা উল্লেখ করার মতো নয়। কয়েকটি ছাড়া বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে নামকাওয়াস্তে গবেষণা হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক-তৃতীয়াংশই নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মনে করে। এগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই গবেষণা খাতে নামকাওয়াস্তে খরচ দেখায়। ব্যবসায়িক মনোভাবের কারণে তারা গবেষণা নিয়ে ভাবে না। ফলে উচ্চশিক্ষার মান বাড়ছে না।

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘গবেষণা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় কেন? বিশ্ববিদ্যালয় নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে, তারা উদ্ভাবন করবে। অল্প কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বাকিগুলো কোনো রকমে চলে। তারা গবেষণায় খরচ করতে পারে না।’

    তিনি বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুরো খরচ সরকার বহন করে। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো টাকা দেয় না। দেখা যায়, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, আরেকজন বেসরকারিতে পড়ছে। একজনকে সবকিছুই দেওয়া হলো, আরেকজনকে কিছুই দেওয়া হলো না। আমার মনে হয় এটা দ্বৈত আচরণ। সরকার, অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন বা ইন্ডাস্ট্রির উচিত হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার জন্য কিছু ফান্ড দেওয়া।’

    ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী গবেষণার ক্ষেত্রে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরও দুরবস্থা। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সালে গবেষণায় খরচ হয়েছে মাত্র ২ লাখ টাকা। রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ হাসিনা বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র পাঁচ লাখ টাকা খরচ করেছে। ছয় লাখ টাকা খরচ করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ। ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণায় খরচ মাত্র ৬ লাখ টাকা।

    সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে গবেষণায় সবচেয়ে বেশি খরচ করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ২০২২ সালে এ বাবদ তাদের খরচ ছিল ৫৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় খরচ ছিল ৮ কোটি টাকা।

    পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ৭ কোটি ৭৫ লাখ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ৫ কোটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ৪ কোটি ৪৫ লাখ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৪ কোটি ২০ লাখ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ৩ কোটি ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা গবেষণায় খরচ করেছে।

    বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ১৫ কোটি ১২ লাখ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ১১ কোটি ৮১ লাখ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ ১০ কোটি ৫৭ লাখ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস ৯ কোটি ৬৮ লাখ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ৮ কোটি ৮৫ লাখ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা গবেষণায় খরচ করেছে। 

    ১ টাকাও খরচ করেনি ১৫ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় : পিপলস্ ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, আশা ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, জেডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়, আনোয়ার খান মডার্ন ইউনিভার্সিটি, জেডএনআরএফ ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেস, বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি ও আরটিএম আল-কবির টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি গবেষণায় কোনো টাকা খরচ করেনি।

    ১ লাখের নিচে খরচ ১১ বিশ্ববিদ্যালয়ের : সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি ২ হাজার টাকা, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি ১৬ হাজার, মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি ৫৭ হাজার, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ১৩ হাজার, রাজশাহী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি ৮৯ হাজার, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ৮৪ হাজার, রণদা প্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয় ৬২ হাজার, ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি চট্টগ্রাম ২০ হাজার, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ২১ হাজার, ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বরিশাল ৯০ হাজার ও ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি ৬ হাজার টাকা গবেষণায় খরচ করেছে। 

    লোকদেখানো খরচ : সিটি ইউনিভার্সিটি ২ লাখ ৭৯ হাজার টাকা, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া ১ লাখ ৮৮ হাজার, মেট্রোপলিটান ইউনিভার্সিটি ২ লাখ ৮০ হাজার, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ১ লাখ ৫০ হাজার, নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ২ লাখ ৫২ হাজার, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ২ লাখ ৩৭ হাজার, খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় ২ লাখ, ফেনী ইউনিভার্সিটি ১ লাখ ৬১ হাজার, ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটি ১ লাখ, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ২ লাখ ৯৮ হাজার, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি ২ লাখ, জার্মান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ২ লাখ ৫০ হাজার এবং রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়-কুষ্টিয়া মাত্র ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা গবেষণা বাবদ খরচ করেছে।

    জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ বলেন, ‘অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার খরচ তো দূরের কথা, শিক্ষকদের বেতনই সময়মতো দিতে পারে না। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা একটি অলীক কল্পনা। অথচ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না তাদের বিশ্ববিদ্যালয় বলা চলে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি বা শিক্ষকরা চেষ্টা করলেও তারা অনেক কিছুই করতে পারেন না।’