কুড়িগ্রামে ১২ প্রাথমিক শিক্ষকের বদলি স্থগিত, ৫ অক্টোবর ফের সভা
নীতিমালা লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ ওঠার পর কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ১২ প্রাথমিক শিক্ষকের বিতর্কিত বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বদলি আদেশের ত্রুটি সংশোধনে আগামী ৫ অক্টোবর উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির সভা ডাকা হয়েছে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও ‘উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’র সভাপতি মাহমুদুল হাসান এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও কমিটির সদস্য সচিব আবু বকর সিদ্দীক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ১২ জন সহকারী শিক্ষককে বদলির আদেশ দেয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি।
আদেশ প্রকাশের পরই অভিযোগ ওঠে, রাজনৈতিক চাপ ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রাপ্যতা না থাকা আটজন শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আবেদনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর তালিকায় পরিবর্তন করে নতুন নাম যুক্ত করার অভিযোগও ওঠে।
‘চাপ প্রয়োগের অভিযোগ সঠিক নয়’
সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে শিক্ষা অফিসে গিয়ে বদলি তালিকা পরিবর্তনে চাপ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমি অফিসে গিয়ে ইউএনও এবং শিক্ষা অফিসারকে ধন্যবাদ দিয়ে এসেছি। আমি কোনো চাপ প্রয়োগ করিনি। যারা অভিযোগ তুলেছেন তারা সঠিক বলেননি।’
তবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দীক বলেন, বদলির আদেশ আপাতত স্থগিত রয়েছে এবং ইউএনও তাঁকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি চেয়েছি বদলির আদেশটি বাতিল হোক। আগামী সোমবার কমিটি আবার সভা করে বদলি আদেশ সংশোধন করবে।’
বদলি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বদলি নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা আমি অস্বীকার করছি না। আমি অসহায়। চাপ নিতে পারছি না। আমাকে তালিকা দিয়ে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে। আমি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছি।’
এক সপ্তাহ আগে তিনি ওই উপজেলায় যোগ দিয়েছেন জানিয়ে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষকদের ভালোভাবে না চেনায় তালিকা যাচাই করাও তাঁর জন্য কঠিন ছিল। তাঁর দাবি, আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে তিনি জড়িত নন এবং তিনি চেয়েছেন বদলি নীতিমালা অনুযায়ী হোক।
৫ অক্টোবর ফের সভা
ইউএনও মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘প্রকাশিত বদলির আদেশ স্থগিত রয়েছে। আগামী সোমবার (৫ অক্টোবর) আবার সভার আহ্বান করেছি। বদলি আদেশের ত্রুটিসমূহ দূর করা হবে।’
যেসব অনিয়মের অভিযোগ
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদে বদলির জন্য ৪৩ জন শিক্ষক আবেদন করেছিলেন। আবেদনের শেষ সময় ছিল ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা।
বদলি সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করে ১২ জন শিক্ষককে বদলির আদেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আটজনের ক্ষেত্রে নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, শূন্য পদ নেই এমন বিদ্যালয়েও শিক্ষক বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, আবেদন না করা শিক্ষককে বদলি এবং আবেদনের সময় শেষ হওয়ার পর তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে।
বদলি তালিকায় দেখা গেছে, দ্বিতীয় ক্রমিকে থাকা বাশিরুল মুমিন খন্দকারের ক্ষেত্রে দুইজনের, তৃতীয় ক্রমিকে থাকা রোখসানা পারভীনের ক্ষেত্রে তিনজনের, চতুর্থ ক্রমিকে থাকা পাপড়ী রানীর ক্ষেত্রে ছয়জনের এবং অষ্টম ক্রমিকে থাকা ফরিদা বেগমের ক্ষেত্রে ১০ জনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ১০ নম্বর ক্রমিকে থাকা আব্দুর রহিমকে পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। তবে শিক্ষা অফিসের শূন্য পদের তালিকায় ওই বিদ্যালয়ের নাম ছিল না। এমনকি তাঁর পছন্দক্রমেও বিদ্যালয়টির নাম ছিল না বলে জানা গেছে।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ১২ নম্বর ক্রমিকে থাকা মাহমুদা আক্তারের বদলি নিয়ে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রকাশিত ৪৩ জন আবেদনকারীর তালিকায় তাঁর নাম নেই। এরপরও তাঁকে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আবেদনের তালিকা পরিবর্তন করে তাঁর নাম যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, তালিকার পঞ্চম ক্রমিকে থাকা মনিরা আক্তারের চাকরি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হলেও তাঁকে ২০১০ সালে যোগদান দেখিয়ে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বঞ্চিত শিক্ষকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক চাপ ও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এসব অনিয়ম করা হয়েছে। তারা বিতর্কিত বদলি আদেশ বাতিল করে নীতিমালা অনুসারে নতুন করে বদলি আদেশ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।