অপ্রতিম হত্যায় উত্তাল কুবি, বিচার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে (১৩) হারিয়ে শোক ও ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর রোববার জানাজা ও দাফন শেষে হত্যার বিচার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি বিশ্বরোড এলাকায় অবরোধ করেন।
এ সময় শিক্ষার্থীরা চার দফা দাবি জানান। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে শাস্তি নিশ্চিত করা, প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে কুমিল্লার পুলিশ সুপার, আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) প্রত্যাহার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় তাৎক্ষণিক রেসপন্স ইউনিট গঠনের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বজন ও স্থানীয়রা অংশ নেন। জানাজার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম অপ্রতিম হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং শিক্ষার্থী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
জানাজা শেষে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কোটবাড়ি বিশ্বরোডের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ও ‘অপ্রতিমের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফ ভূইয়া বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণই পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা। পুলিশ বলে, ক্লু পেয়েছি; কিন্তু কী ক্লু তারা পেয়েছে, সেটা আমরা জানি না। এই ব্যর্থতার দায় যতক্ষণ না তারা নেবে, আমরা ততক্ষণ রাস্তায় আছি।’
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা আজ কেবল অপ্রতিমের জন্য এখানে আসিনি। কুমিল্লায় এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। আমরা অপ্রতিমের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
যেভাবে নিখোঁজ হয়েছিল অপ্রতিম
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ওই দিনই তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
পরে পরিবার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে তার সন্ধানে তল্লাশি চালান। নিখোঁজের প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের কাছের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
দাফন সম্পন্ন, পরিবারের আহাজারি
প্রথম জানাজার পর গন্ধমতি ঈদগাহে অপ্রতিমের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বাসার পাশের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
দাফনের আগে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘আমার আর নতুন করে কিছু বলার নেই। আমি কেবল আমার সন্তান হত্যার উপযুক্ত বিচার দেখতে চাই। আমার মাত্র ১৩ বছর বয়সী নিষ্পাপ ছেলেটা কোনো অপরাধ করেনি। তবে কেন তাকে এভাবে প্রাণ দিতে হলো? এই মুহূর্তে আমি শুধু ঘাতকদের কঠোর বিচার চাই।’
অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘ও-ই ছিল আমাদের সব। ওকে ঘিরেই আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল। আজ ঘরে ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় ওর জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই। আমরা কীভাবে এই শূন্যতা মেনে নেব, জানি না।’
অপ্রতিমের মৃত্যুতে কুবি ক্যাম্পাসে শোকের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।