তাকজুড়ে সারি সারি বই। পাশে সাজানো চেয়ার-টেবিল। প্রতিদিনের সংবাদপত্রও আসে। পরিচ্ছন্ন ভবন, আলো-বাতাস আর পড়ার উপযোগী পরিবেশ—সবই আছে। শুধু নেই পাঠক। দিনের পর দিন বইয়ের তাকগুলো নীরব পড়ে থাকে, খালি পড়ে থাকে পাঠকের জন্য রাখা চেয়ার-টেবিল।
মাঝেমধ্যে দু-একজন শিক্ষার্থী এলেই পাঠাগারে পাঠকের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। একসময় যেখানে বই পড়তে মানুষের আনাগোনা ছিল, সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের বিস্তারে বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
এমন চিত্র দেখা গেছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারে। প্রায় এক দশক আগে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও দুই পাঠাগারেই এখন পাঠকের উপস্থিতি তুলনামূলক কম। বকশীগঞ্জে মাঝেমধ্যে কিছু শিক্ষার্থী এলেও দেওয়ানগঞ্জের পাঠাগারে নিয়মিত পাঠক পাওয়া কঠিন। অথচ দুই পাঠাগার মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ২০ হাজার বই।
ভবন আছে, বই আছে, নেই পাঠকের ভিড়
দেওয়ানগঞ্জ শহরের অদূরে এ কে মেমোরিয়াল কলেজ ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে আছে সরকারি গণগ্রন্থাগারের দোতলা ভবন। নিচতলায় প্রায় ২০০ মানুষের ধারণক্ষমতার মিলনায়তন এবং দ্বিতীয় তলায় মূল পাঠাগার।
দৃষ্টিনন্দন ভবনটির ভেতরেও রয়েছে পাঠবান্ধব পরিবেশ। বিভিন্ন বিষয়ের বইয়ে সাজানো একাধিক তাক, কাঠের চেয়ার-টেবিল এবং দৈনিক সংবাদপত্র পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এসব আয়োজনের সঙ্গে পাঠকের উপস্থিতির মিল খুব একটা নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাঠাগারের ভেতরে নীরবতা। বেশির ভাগ চেয়ার-টেবিলই খালি। তাকভর্তি বই থাকলেও সেগুলো পড়তে আসা মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
স্থানীয়দের একটি অংশের মধ্যেও পাঠাগারটি নিয়ে রয়েছে বিভ্রান্তি। কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে হওয়ায় কেউ কেউ এটিকে কলেজের নিজস্ব গ্রন্থাগার মনে করেন। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত সরকারি গণগ্রন্থাগার হওয়া সত্ত্বেও অনেকে সেখানে আসেন না।
বকশীগঞ্জে পাঠক আছেন, নিয়মিত নন
বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত সরকারি গণগ্রন্থাগারটিও দোতলা। পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন ভবনের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে মূল পাঠাগার। বিভিন্ন ধরনের বইয়ের পাশাপাশি পাঠকদের জন্য চেয়ার-টেবিল ও সংবাদপত্র পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
সরেজমিনে সেখানে গিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দেখা যায়। কেউ বই পড়ছিলেন, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। তবে পাঠাগারের আকার ও সুযোগ-সুবিধার তুলনায় পাঠকের সংখ্যা ছিল খুবই কম।
শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানান, পাঠাগারের পরিবেশ ভালো এবং বিভিন্ন ধরনের বইও রয়েছে। তবে নিয়মিত পাঠকের সংখ্যা কম। বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজেই তথ্য পাওয়া যায়। ফলে বই নিয়ে পাঠাগারে বসার অভ্যাস আগের তুলনায় কমেছে।
প্রায় ২০ হাজার বই, ব্যবহার কতটা?
গণগ্রন্থাগার সূত্রে জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তর ২০১৩ সালে দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারের নির্মাণকাজ শেষ করে। প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে ২০১৫ সালে পাঠাগার দুটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
দুই পাঠাগার মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ২০ হাজার বই। সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্ম, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধসহ নানা বিষয়ের বই রয়েছে সেখানে। পাঠকদের জন্য রাখা হয় দৈনিক সংবাদপত্রও।
অর্থাৎ বইয়ের অভাব নেই, নেই বসার জায়গার সংকটও। অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার ঘাটতিও বড় সমস্যা নয়। কিন্তু পাঠাগারের মূল প্রাণ—পাঠক—সেই তুলনায় অনেকটাই অনুপস্থিত।
বদলে গেছে পাঠাভ্যাস
একসময় শিক্ষার্থী ও তরুণদের অবসর কাটানোর অন্যতম জায়গা ছিল পাঠাগার। গল্প, উপন্যাস, কবিতা কিংবা সাধারণ জ্ঞানের বই পড়তে অনেকে নিয়মিত পাঠাগারে যেতেন। এখন সেই জায়গার বড় অংশ দখল করেছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদন।
কোনো তথ্য জানতে বইয়ের পাতা উল্টানোর বদলে কয়েক সেকেন্ডেই ইন্টারনেট থেকে উত্তর পাওয়া যায়। অবসর সময়েও বইয়ের বদলে ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সময় কাটাচ্ছেন অনেকে।
ফলে পাঠাগারের দরজা খোলা থাকলেও পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে না। আবার শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের পড়াশোনাও সীমাবদ্ধ থাকছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক বইয়ের মধ্যে।
শুধু ভবন বানালেই কি পাঠক ফিরবে?
দুই পাঠাগারের চিত্র বলছে, অবকাঠামো তৈরিতে বিনিয়োগ থাকলেও পাঠক তৈরির জন্য নিয়মিত কার্যক্রমের ঘাটতি রয়েছে। পাঠক ফেরাতে বইপাঠ কর্মসূচি, পাঠচক্র, সাহিত্য আড্ডা, কুইজ, বিতর্ক ও শিশু-কিশোরদের জন্য আলাদা আয়োজন করা যেতে পারে।
স্কুল-কলেজের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠাগারে আনার উদ্যোগও নেওয়া সম্ভব। পাশাপাশি পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী বই সংগ্রহ, বই পরিচিতি অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন জ্ঞানভিত্তিক আয়োজন চালু করা যেতে পারে।
কর্মজীবী ও বিভিন্ন পেশার মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে পাঠাগারের কার্যক্রমের সময় বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু নির্দিষ্ট অফিস সময়ের মধ্যে পাঠাগার খোলা রাখলে কর্মজীবী মানুষের একটি বড় অংশ সেখানে যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
জনবল সংকটেও থমকে কার্যক্রম
দুই পাঠাগারের দায়িত্ব পালন করছেন বকশীগঞ্জ উপজেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. মোখলেছুর রহমান। বকশীগঞ্জের পাশাপাশি তিনি দেওয়ানগঞ্জ গণগ্রন্থাগারের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন।
তথ্য অনুযায়ী, বকশীগঞ্জ গণগ্রন্থাগারে তিনজন এবং দেওয়ানগঞ্জে মাত্র দুজন দায়িত্ব পালন করছেন। সীমিত জনবল দিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে পাঠক তৈরির জন্য আলাদা উদ্যোগ নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে।
কী বলছেন সংশ্লিষ্টরা
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী বলেন, গ্রন্থাগারে পাঠক না থাকা দুঃখজনক বাস্তবতা। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে। তবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে পাঠাভ্যাস বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। চাকরির পরীক্ষাকেন্দ্রিক পড়াশোনার বাইরে জ্ঞান, সাহিত্য ও মননচর্চার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
জামালপুর সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল হাই আলহাদী বলেন, একসময় পাড়া-মহল্লায় পাঠাগার গড়ে তোলার যে সংস্কৃতি ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। কেন পাঠক তৈরি হচ্ছে না, তা নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন।
বকশীগঞ্জ উপজেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, দুই পাঠাগারের অন্যতম সমস্যা জনবল। বকশীগঞ্জে তিনজন এবং দেওয়ানগঞ্জে দুজন দায়িত্ব পালন করছেন। দেওয়ানগঞ্জের পাঠাগারটি কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে হওয়ায় অনেকে এটিকে কলেজের গ্রন্থাগার মনে করেন। এ কারণে সেখানে সাধারণ পাঠকের উপস্থিতি খুব কম। পাঠক বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রচারণাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জাতীয় কবিতা পরিষদ জামালপুর জেলা শাখার উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, মানুষকে পাঠাগারে ফেরাতে সামাজিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। অফিস সময়ের পর পাঠাগার বন্ধ থাকলে চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সেখানে যাওয়ার সুযোগ পান না। পাঠক আকৃষ্ট করতে বইপাঠ কর্মসূচি, প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের আয়োজন করা যেতে পারে।
বকশীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন বলেন, পাঠাগারের প্রচারে নিয়মিত কাজ করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের পাঠাগার সম্পর্কে জানানো এবং বই পড়তে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রচারের মাধ্যমে পাঠকরা আবারও পাঠাগারমুখী হবেন বলে আশা করেন তিনি।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ জহুরুল হোসেন বলেন, পাঠাগারে পাঠক বাড়াতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে পাঠাগারমুখী করতে স্কুল-কলেজে প্রচার-প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আফসানা তাসলিম বলেন, পাঠাগারে পাঠক বাড়াতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন, যাতে পাঠাগারগুলোতে পাঠকের সংখ্যা বাড়ে।
সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—তাকভর্তি বই আর দৃষ্টিনন্দন ভবনই কি একটি পাঠাগারের সাফল্যের মাপকাঠি? নাকি সেই বই মানুষের হাতে পৌঁছানো, পাঠের অভ্যাস তৈরি করা এবং নিয়মিত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ গড়ে তোলাই একটি গণগ্রন্থাগারের প্রকৃত সার্থকতা?